
ইরানে সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কঠোর অভিযানের কথা জানিয়েছেন একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী। তাঁদের বর্ণনায় উঠে এসেছে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠিন অবস্থান, ব্যাপক প্রাণহানি এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া গভীর আতঙ্কের চিত্র।
দক্ষিণ ইরানের একটি ছোট শহরে চলমান বিক্ষোভয়ে অংশ নেওয়া ৪০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি (ছদ্মনাম: ওমিদ) জানান, তিনি নিজ চোখে দেখেছেন কীভাবে নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মানুষ যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানেই তারা লুটিয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, বিক্ষোভকারীরা খালি হাতে অর্থনৈতিক সংকট ও দমনমূলক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছিলেন।
গত বৃহস্পতিবার ইরানের বিভিন্ন শহরে বড় পরিসরে বিক্ষোভ শুরু হয়। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত শাহ রাজবংশের নির্বাসিত রাজপুত্র রেজা পাহলভির আহ্বানের পর বহু মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। পরদিন শুক্রবার সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি আন্দোলনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানান। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ওই বক্তব্যের পরই পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
তেহরানের এক তরুণী জানান, বৃহস্পতিবারের পরিস্থিতি তাঁর কাছে ‘অত্যন্ত ভয়াবহ’ মনে হয়েছিল। তাঁর দাবি, শুক্রবার নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। তিনি বলেন, ঘটনার পর অনেক মানুষ রাস্তায় নামতে ভয় পাচ্ছে। অনেকে ঘর বা গলির ভেতর থেকেই প্রতিবাদ জানাচ্ছে। তাঁর ভাষায়, এটি যেন একতরফা দমনমূলক পরিস্থিতি।
তেহরানের পশ্চিমাঞ্চলের শহর ফারদিসের আরেক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, শুক্রবার কিছু সময় রাস্তায় পুলিশ না থাকলেও হঠাৎ করে বাসিজ বাহিনীর সদস্যরা মোটরসাইকেলে এসে অভিযান শুরু করে। তাঁর দাবি, বিক্ষোভে অংশ না নেওয়া সাধারণ মানুষও এই অভিযানের প্রভাব থেকে রেহাই পাননি।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো ইরানের ভেতরে স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারায় তথ্য যাচাই কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে তারা দেশের বাইরে সক্রিয় মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যের ওপর নির্ভর করছে। নরওয়েভভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ইরান হিউম্যান রাইটস’ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সহিংসতায় অন্তত ৬৪৮ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৮ বছরের কম বয়সী কয়েকজনও রয়েছে। তবে এই তথ্যগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে, ইরানি কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভকারীদের প্রাণহানির বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, বিক্ষোভ চলাকালে নিরাপত্তা বাহিনীরও বহু সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন।
সব মিলিয়ে, ইরানে চলমান পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।